এই চিঠিতে লেখক বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের পার্বত্য অঞ্চলে জুমভিত্তিক জীবনযাত্রা, স্থানীয় খাবার, খেলা, গল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে একটি বিবর্তনশীল সংস্কৃতির সোনালি অতীত তুলে ধরেছেন। তিনি তার স্থায়ী গ্রামের বাড়ি ‘আদামঘর’ এবং পাহাড়ে অস্থায়ী ‘মোনোঘর’ বা জুমঘরের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে জুম চাষের মাধ্যমে জীবনযাপন, প্রকৃতির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া, স্বতঃস্ফূর্ত বিনোদন ও পারিবারিক বন্ধনের চিত্র ফুটে উঠেছে। চিঠিটি পাঠিয়েছেন সুজন চাকমা; চিত্রায়ণ: ইমরান হাসান, সামিহা নওশীন, সমবৃতা খান।
প্রিয় আগামী প্রজন্ম,
আকাশসম ভালোবাসা আর পাহাড়সম স্নেহ (কিরবে) নিও। খুব করে মন চাচ্ছিলো তোমাদের উদ্দেশ্যে আমার ছোট বেলার স্মৃতিকথা লিখে যাওয়ার। হয়তো ভাবতে পারো, এ সব পুরোনো দিনের কথা পড়েই বা কি হবে? কিন্তু না, এ লেখা পড়ে তোমরা বুঝতে পারবে আমাদের সময়কার পরিবেশ কেমন ছিলো, অনুধাবন করতে পারবে আমাদের এবং তোমাদের সময়ের মধ্যে মিল ও পার্থক্য কতটা। আমি নিশ্চিত, তোমরা এ চিঠিটা পড়ার পর আমাদের সেই সোনালী অতীতের কথা কল্পনা করবে আর মনে মনে আপসোস করবে। সে যাই হোক, সংক্ষিপ্ত লেখার মধ্য দিয়ে আমি যতটুকু সম্ভব তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আমাদের দু’ধরনের বাড়ি ছিল- স্থায়ী ও অস্থায়ী। আমার জন্মস্থান ‘ভালেদি আদাম’ নামক গ্রামে ছিল স্থায়ী বসতবাড়ি। স্থায়ী বাড়িকে বলি ‘আদামঘর’, আর অস্থায়ী বাড়িকে বলি ‘মোনোঘর’। আর অস্থায়ী বাড়ি ছিল গ্রাম থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থিত দুর্গম পাহাড়ে। হয়ত বুঝতে পারছো না, কেন দুর্গম পাহাড়ে আমাদের বাড়ি ছিল। আমি সব খুলে বলবো, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথাও। প্রথমে গ্রামের স্থায়ী বাড়ি ও তার আশপাশের কথাই বলছি।
আমার জন্মের অনেক আগে আমাদের সেই স্থায়ী বাড়ির জায়গাসহ পুরো এলাকা ছিল গভীর অরণ্যে ভরপুর। কাপ্তাই বাঁধের ফলে আমার দাদুদের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেলে তারা এখানে চলে আসে। প্রথম দিকে হিংস্র বন্য প্রাণীর ভয় ছিল। এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে জীবন-মরণের সাথে লড়ায় করে গেছে আমার পূর্ব প্রজন্মরা। তারা যদি না জানাত আমি কখনো জানতে পারতাম না সেসব কথা। অতীতের ঘটনা বা ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে যাওয়া এটাও একটা কর্তব্য। সেই তাড়না থেকে আমিও লিখছি।
আমাদের গ্রামের বাড়ি বা আদাম-ঘরটি ছিল একপাশ উঁচু, একপাশ নিচু এমন একটি জায়গায়। উঁচু অংশে ছিল মূল ঘর বা সিংগোবা আর নিচু অংশে ছিল রান্নাঘর বা পিজোর। মূলঘরটি ছিল চৌচালা আর রান্না ঘরটি ছিল দোচালা। বাড়িতে অতিথি আসলে মূলঘরে জায়গা সংকুলান না হলে আমরা রান্না ঘরে পাটি বিছিয়ে ঘুমাতাম। ছাউনির জন্য তখন শন ছিল একমাত্র অবলম্বন, পরে অবশ্যই টিনের ছাউনি হয়। বান্নাঘর বা পিজোরের সাথে লাগোয়া ছিল একটি ইজোর (মাচাংয়ের মত)। ইজোরসহ পুরো ঘর তৈরির প্রধান উপাদান গাছ ও বাঁশ। বর্ষাকাল ছাড়া সারা বছরই সেই ইজোরটি ছিল আমার সবচেয়ে ভালো লাগার স্থান, যেখানে সব মধুময় স্মৃতিগুলোর জন্ম হয়েছে। শীতকালে সকাল-সন্ধ্যায় আগুন পোহাতাম ইজোরে। ইজোরের উপর শক্ত কাঠ বা টিনের টুকরা বিছিয়ে মাটি দিয়ে তৈরি করা হতো এই অতিরিক্ত চুলা। বাতাস কম হলে, বৃষ্টি না হলে মা প্রায় সময় সেখানে বান্নাবান্না ও পিঠা তৈরি করতো। তার মধ্যে ছিল সান্যে পিঠা, বরা পিঠা, বিন্নি চালের খগা পিঠা, কলা পিঠা। দুপুরের পর সূর্য যখন পশ্চিমদিকে অবস্থান করে তখন আমাদের সেই ইজোরে ছায়া পড়ে যায়। দিনের আলোতে সেখানে আমরা পাটি বিছিয়ে চকচক খারা (বিশেষ ধরনের ফলের বীজ দিয়ে খেলা), শামুক খারা (খেলা) খেলতাম। পূর্ণিমা রাতে চাঁদ যখন জ্যোৎস্না ছড়ায় তখন সেই ইজোরে মায়ের কোলে শুয়ে শোনা হতো অসংখ্য রূপকথা, যা ছোটকালে আমরা সত্য কাহিনী মনে করে বিশ্বাস করতাম। চাঁদের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ধান ভানা ও ধবল কুকুরের তুষ খাওয়ার কথা শুনে ও কল্পনা করে কতবার যে বোকা বনে গেছি তার হিসেব নেই। এখন মনে পড়লে বড্ড হাসি পাই। তোমরাও হাসবে নিশ্চয়! দুলোহ্ কুমোরীর পচ্ছন, ক’বি-ধ’বি কিত্যেহ্, সিরিফলর পচ্ছন, রোঙ্যেহ্ বেঙার গপ ইত্যাদি ছিল তখন গল্প-আড্ডার মূল। এছাড়াও ছোটকালে ধাঁধা (বান্নাহ্) ধরাধরি ছিল আমাদের নিত্যদিনের কর্ম। সেসব মনে করতে করতে আমার এক বড় বোন মেয়েবি-কে খুব মনে পড়ছে। যার সাথে সে সময়গুলো কাটানোর সুযোগ পেয়েছি।
ইজোরের পিছনে গাছগাছালী ছিল। সেগুলোর উপর প্রায়ই থাকতো ঝিঙা, চিচিংগা, ধুন্দলের শাক বা লতা। ধুন্দলের “ছোবা” পাতিলা পরিস্কারের কাজে জালি হিসেবে ব্যবহার হতো। ঝিঙা, চিচিংগা, ধুন্দল ছাড়াও বিভিন্ন পাহাড়ী সবজি ‘রেহ্ং’ (লতায় ধরে এমন বুনো আলু) ইত্যাদির লতাও দখল করতো ইজোরের আশপাশের গাছ-গাছালীদের।
এবার দুর্গম পাহাড়ে অস্থায়ী বাড়ি বা মোনোঘর ও তার আশপাশের পরিবেশ কেমন ছিল তা জানাচ্ছি। মূলত জুম চাষের উদ্দেশ্যে মোনোঘর তোলা হতো। মোন অর্থ পাহাড় বা পর্বত আর ঘর মানে ঘর। পাহাড়ে তোলা হয় বলে “মোনোঘর”। আবার জুম চাষের উদ্দেশ্যে তোলা হয় বলে “জুমঘর”ও বলে অনেকে। যেহেতু অস্থায়ী হিসেবে তোলা হয় সেহেতু খুব বেশি সাজানো গোছানো হয় না এই ঘর। শনের ছাউনি দিয়ে দোচালা ছিল আমাদের মোনোঘর। বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ার সুবিধা না থাকলে মাটি থেকে কিছুটা উঁচু রেখে মাচাংয়ের মতো করে বাড়ি নির্মাণ করা হতো। ফসল উৎপাদনের পর মাটিতে পুনরায় উর্বরতা ফিরিয়ে আনার জন্য কয়েক বছর অনাবাদি রেখে দিয়ে নতুন চাষযোগ্য জায়গায় জুম চাষ করতে হতো বলে স্থান পরিবর্তনের সাথে ঘরও পরিবর্তন করতে হয়েছে অনেক। তবে মোনোঘরের গঠনকাঠামো প্রায়ই একই ধরনের ছিল। পাহাড়ের পাদদেশে শনের ছাউনি দিয়ে দোচালা ঘর, লাগোয়া থাকতো মাচাং বা ইজোর যা দূর থেকে দেখতে অসম্ভব সুন্দর দেখাতো। মোনোঘরের আশপাশে বিভিন্ন ফসলের সাথে চাষ করা হতো টকপাতা, তিতা শাক, সুচ মরিচ, জুম্মো বাঘোর (ধনিয়া) পাতা, মিষ্টি কুমড়া, পুইশাক ইত্যাদি। প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হওয়া মিধে-বেগোল (তিতবেগুন), তিদে-বেগোল (পুটকি বেগুন), বরনা-শাক (Mezenga Leave), খনা-গুলো (কানাইডিংগা) সহ আরো অনেক বুনো উদ্ভিদের ফল ও পাতা(শাক) আমাদের খাবারের তালিকায় ছিল। লবণ ও তেল ছারা খাবার তৈরিতে প্রয়োজনীয় প্রায় সকল উপাদান পাওয়া যেত জুম থেকে। জুমে যখন ধান পাকা শুরু হয় তখন চারিদিকে পাকা ধানের রঙে জুম ভরে উঠে। তখন টিয়া, উঘুরিক পাখির (একধরনের ছোট পাখি) ঝাঁক প্রতিদিন আনাগোনা করে। সুযোগ পেলেই এক নিমিষে শেষ করে দিয়ে যায়। তাই তাদের তাড়ানোর জন্য শব্দ সৃষ্টিকারী এক ধরনের বাঁশের যন্ত্র ‘তাক’ ব্যবহার করতাম আমরা। এছাড়াও জুমের মধ্যে টিনজাতীয় বাক্সের ভেতর ঘন্টা টাঙিয়ে দড়ির সাহায্যে শব্দ সৃষ্টি করে দূর থেকে পাখি তাড়াতাম।
কাজের চাপ কমলে বিনোদনের জন্য নিজেদের তৈরি বাদ্যযন্ত্র যেমন- বাঝি (বাঁশি), ধুধুক, সিঙে, খেংগরং (তুলনীয়: Mouth organ) বাজানো হতো। আমাদের মধ্যে সবার বড় ভাইটি বাঁশি বাজাতো মধুর সুরে । মা বাজাতো খেংগরং। দূর থেকে শোনা যেত সিঙে’র শব্দ। অনেকে দূর থেকে সিঙে’র সুরে ডাকাডাকি করতো বা সংকেত পাঠাতো। পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতো সেসব শব্দ।
সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছই বিলুপ্ত হতে চলেছে, যেমনটা বিলুপ্তির পথে জুমচাষ। এককালে আমাদের পূর্ব প্রজন্মের সাথে, আমাদের জীবনের সাথে জুম নিবিড়ভাবে ঘনিষ্ট ছিল। জুম’ই ছিল আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। বিভিন্ন কারণে জুমচাষ পদ্ধতি হয়তো কালের স্রোতে হারিয়ে যাবে, কিন্তু পাহাড়কে আমরা জুম ভেবেই আঁকড়ে থাকবো, ভালোবাসবো। কি ভালোবাসবে তো? তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে- তোমরা কখনো শেকড়কে ভুলে যাবে না, ভুলে যাবে না আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা।
তোমরা হবে নতুন যুগের গেংখুলি (চারণকবি)। তোমরাই হবে কিজিঙৎ পুগোবেল (গিরিখাদে লাল সূর্য)। তোমাদের চিন্তা-চেতনায়, অন্তরে-কন্ঠে ধারণ ও বহন করবে স্বকীয়তা। শুভ হোক তোমাদের পথচলা। তোমাদের জন্য নিরন্তর শুভ কামনা।
ইতি
তোমাদের বিগত প্রজন্মের একজন
জুম্মোধন
(সুজন চাকমা)
১৭/১০/২০২৩
রাঙামাত্যে, মুরোল্যেহ্ চাদিগাঙ, বাংলাদেচ।
সৌজন্যে: স্নেহলতা চাকমা




হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রাম। হারিয়ে যাচ্ছে মাটি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্ক। জীবন ও জীবিকার সংগ্রামে আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের শেকড়। গ্রামের বাড়ি আজ যেন এক নস্টালজিয়া। শুধু বেঁচে আছে আমাদের স্মৃতিতে। কি রেখে যাচ্ছি আমরা ভবিষ্যত প্রজন্মের উদ্দেশ্যে? সেই শিকড়ের খোঁজে আমরা খোলা চিঠির আহ্বান জানিয়েছিলাম।
আপনি যদি অংশগ্রহণের কথা বিবেচনা করে থাকেন তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিঠিটি প্রেরণ করুন।
বিস্তারিতঃ http://localhost/context/events/event/basatbari/
ইমেইল: boshotbari.context@gmail.com; contextbd.editor@gmail.com
Disclaimer:
CONTEXT (www.contextbd.com) and their collaborators jointly hold the copyrights of all contents including, but not limited to, all text, information, illustrations, images. You may not duplicate or reproduce any of the content on this website, including files downloadable from this website.